Lalu
Lalu
                      লালু (Bangla Choto golpo)

সময়টা আশ্বিন মাস । দুর্গাপূজো সবে শেষ হয়েছে । আশ্বিনের ঝরাপাতা ইঙ্গিত দিচ্ছে শীত আসতে খুব একটা দেরি নেই।গত ছয় মাস ধরে মিলেনিয়াম পার্কের একটা বেঞ্চেই হলো লালুর ঠিকানা ।লালুর বয়স মোটামুটি  বত্রিশ  হবে । ছিপছিপে দেহের গঠন ও গায়ের রং শ্যাম বর্ণ । শরীরের অবস্থা খুব একটা ভালো না হওয়ার আগের মতো কায়িক পরিশ্রম করে খেতে পারে না। অগত্যা লোকের দয়ার উপর নির্ভর করতে হয়। 

       শীতকালে আর পাঁচজন বাঙালি যখন  দার্জিলিং সিমলা ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করে লালু তখন চিন্তা করে শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য কোনোরকম একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবার । আর তার জন্য আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের থেকে ভালো ঠিকানা আর কিই বা হতে পারে।কোনোরকমে  সরকারি জামাই হয়ে যেতে পারলেই তিন-চার মাস শীতের হাত থেকে মুক্তির পাশাপাশি বিনামূল্যে খাবার দাবার ব্যবস্থাও হয়ে যাবে। এসব চিন্তাই লালুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো।

প্রথম প্রয়াস  :  লালু দাঁড়িয়ে আছে একটা নামি দামি রেস্তোরাঁর বাইরে। যেখানে সাইনবোর্ড ইংরেজিতে লেখা " The Bar-B-Q". লালু খবর নিয়েছে এখানে নাকি খুব সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। লালু ভাবলো এই রেস্টুরেন্টে যদি কোনোরকমে খাওয়া দাওয়া করা যায়  এবং তারপর টাকা নেই বলে সারেন্ডার করে দেওয়া যায় তাহলে তিন মাসের জেল তো পাক্কা। কিন্তু পরক্ষনে ভাবলো তার কাছে তো ভালো পোশাক সেরকম নেই, তাহলে এখানে ঢুকবে কিকরে? তারপর মনে পড়লো এইতো কয়েকদিন আগে পুজোর সময় একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফ থেকে একটা নতুন জামা পেয়েছিল। সেটা পরে বেয়ারার নজর এড়িয়ে কোনোরকমে সামনের চেয়ার একটা দখল করতে পারলেই ব্যাস আর চিন্তা নেই, নীচের জীর্ণ প্যান্ট ও ছেঁড়া জুতো কারো নজরে পড়বে না। আর সে তার লক্ষ্য পূরণে সফল হবে। কিন্তু হলো ঠিক উল্টোটা। রেস্তোরাঁতে প্রবেশ করতে যাওয়ার সময় ম্যানেজারের নজর পড়ে যায় তার উপর। তারপর যা হবার তাই হলো। সিকিউরিটি গার্ড এসে লালুকে চেংদোলা করে বাইরে ফুটপাতে নামিয়ে দিলো। এভাবে লালুর প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো।

দ্বিতীয় প্রয়াস : প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার দুদিন পর লালু নিউমার্কেটের কাছে ইতস্ততঃভাবে ঘোরাফিরার সময় একজন কর্তব্যরত পুলিশকর্মীকে দেখে হঠাৎ করে তার মাথায় একটা প্ল্যান আসে। রাস্তার পাশে একটা পাথর তুলে সামনের একটা গহনার দোকানের কাঁচে ছুঁড়ে মারে। ঘটনাটা ঘটার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চারিদিকে একটা হুলস্থুল রব ওঠে। সবাই আতঙ্কিত হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। লালু কিন্তু কান্ডটা ঘটানোর পরেও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলো । পুলিশকর্মীটি কারণ অনুসন্ধানের জন্য এসে লালুকে জিজ্ঞাসা করলো,  " তুমি কাউকে পাথরটা ছুঁড়তে দেখেছো?  বলতে পারবে সে কোন দিকে গেলো? " লালু হাসতে হাসতে উত্তর দিলো,  "এই তো আমিই পাথরটা ছুঁড়েছিলাম।  " পুলিশটি বেশ বিরক্ত হয়ে তাকে ধমক দিলো এবং বললো, " ধুর হতচ্ছাড়া ! পাথর ছুঁড়ে  কি কেউ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে? যতসব পাগলের বাস হয়েছে এই কলকাতায়। " এই বলে পুলিশকর্মীটি অন্যদিকে চলে গেলো। এভাবে লালুর দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো।

তৃতীয় প্রয়াস : দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার দিন চারেক পর লালু শিয়ালদহ স্টেশনের কাছে ফ্লাইওভারের নীচে একজন সুন্দরী মহিলাকে দেখলো দাঁড়িয়ে থাকতে। পরনে তার লাল শাড়ী, মাথায় জুঁই ফুলের মালা। লালুর মনে হলো ইভটিজিং  করলে শীতের হাত থেকে বাঁচার  পাক্কা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এই ভেবে লালু মহিলাটির দিকে এগিয়ে গেলো। তার কাছে যেয়ে ফিল্মি কায়দায় বললো, " ও ছামিয়া চলতি হ্যা কেয়া 9 সে 12 ? " মহিলাটি প্রথমে পাত্তা দিলো না। লালু আবার বললো, " চল না "।  এবারে মহিলাটি উত্তর দিলো, বললো "কতো দিবি? "  একথা শুনে লালু আর কোনো কথা না বলে  সেই জায়গা থেকে পালালো। এভাবে তার তৃতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো। 

          পরপর এতগুলো প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় লালু মনে একটু কষ্টই পেয়েছে।   শীতটা কিভাবে কাটাবে এই চিন্তা করতে করতে লালু রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো  আর ভাবছিলো এইতো একবছর আগেই তারও একটা পরিবার ছিলো, মাথার উপরে ছাদ ছিলো, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কুলির কাজ ছিলো।পরিবার বলতে অবশ্য তার বিধবা মা ও সে। হঠাৎ  তার মায়ের শরীরে বাসা বাঁধে মারণ রোগ ক্যান্সার। মায়ের চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি রাখেনি সে। চিকিৎসার জন্য ঘটি বাটি থেকে শুরু করে শেষ সম্বল আশ্রয়টুকুও বিক্রি করে দিয়েছে। এসব সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। বাঁচাতে পারেনি মাকে। মায়ের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজের প্রতি অবহেলার ফলে ভেঙ্গে পড়েছে তার নিজের শরীরও। ফলে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাজটাও হারিয়েছে। আজ সে সর্বহারা। তাই গত ছয় মাস ধরে একপ্রকার বাধ্য হয়ে মিলেনিয়াম পার্কের বেঞ্চে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করেছে। দিনের বেলায় শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। কপালে যা জোটে তাই খায়। কিন্তু এভাবে আর কতোদিন ?  লালু মনস্থির করলো আবার নতুন করে শুরু করবে বলে, কোথাও না কোথাও একটা কাজ ঠিক  জুটিয়ে নেবে সে । এমন সময় তার কাঁধে একজন হাত রাখলো। মুখ ফিরে লালু দেখলো একজন পুলিশকর্মী, হাতে তার একটা হাতকড়া ঝুলছে। বললো " চলো বাবা অলংকার দোকানে পাথর ছোঁড়ার অপরাধে কয়েকদিন মামা বাড়িতে কাটাবে। "

*******************************************************
কলমে : সৌরভ সৎপতি

5 Comments

Please do not enter any spam link in the comment box.

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.

Previous Post Next Post