হুল দিবস কী? কেনো পালন করা হয় হুল দিবস?

 

hul_divas

 

ব্রিটিশরা তো ছিলই, সঙ্গে দেশীয় মহাজন , সবাই মিলে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল ! কি নেই সেই লিস্টে !সহজ সরল, প্রকৃতির কোলে নির্বিবাদে নিজেদের মত বেঁচে থাকা আদিবাসীদের জমি দখল, ঋনের ফাঁদে ফেলে গৃহপালিত পশু ঘর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া থেকে প্রজন্ম ধরে বেগার খাটানো, ঠকানো, মা বোনেদের ওপর পুলিশি অত্যাচার, কাজ করিয়ে বেতন না দেওয়া, প্রতিবাদ করলে ব্রিটিশ পুলিশের নির্মম অত্যাচার, জেল, নির্বিচার হত্যা...


 শালগাছের ডাল দিয়ে আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে পৌঁছে যেত বিদ্রোহের বার্তা, আমন্ত্রণ ; এরকমই এক দিনে ,1855 এর 30শে জুন,  সিধো, কানু, চাঁদ, ভৈরো চার ভাইয়ের নেতৃত্বে ঘন জঙ্গল ঘেরা ভাগনাডিহি গ্রামে জমায়েত হন প্রায় হাজার হাজার সাঁওতাল, বীরহড়, মুন্ডা,মাহালি, খেড়িয়া, ভূমিজ,কুড়মি.. সিদ্ধান্ত হয় রুখে দাঁড়ানোর ; পলাশ, মহূল ডুংরি  ঘেরা ছোটনাগপুর জুড়ে ধমসা মাদলের রনদুন্দুভির নির্ঘোষে উচ্চারিত হয় - হুল! হুল !  বাকি ভারত তখনও ব্রিটিশের তাঁবেদার !


ভারতের প্রথম স্বাধীনতার জন্য ডাকও এটাই ; প্রথম লং মার্চও এটা, ভগনাডিহ থেকে কোলকাতার পথে  এগিয়ে চলে মিছিল ;  কোলকাতার বুদ্ধিজীবিরা তখনও ছিলেন, ওখানের পত্রপত্রিকাগুলো তখন ব্রিটিশ শাসকদের হয়ে খবর পরিবেশন করে , "ইংরেজদের বিরুদ্ধে এই মিছিল ঘোরতর অন্যায়, অবিলম্বে সরকার বাহাদুর ইহাদের দমন করুন .."


ভারতের প্রথম গেরিলা যুদ্ধও এটাই ; প্রায় আটমাস বিদ্রোহীরা লড়ে গেছেন দেশমাতৃকার পরাধীনতা মোচনে ; অসম্ভব নির্মমতার সঙ্গে এই বিদ্রোহ দমন করা হয় ; সরকারি হিসেবে, তিরিশ হাজার আদিবাসীকে হত্যা করা হয় ; ভারতবর্ষে প্রথম সামরিক আইন জারি হয় এই বিদ্রোহকে দমন করতে ; সিধুকে গুলি করে খুন করা হয়, কানুকে ফাঁসি দেওয়া হয় ; তাঁদের বোন ফুলো মুর্মুর ধর্ষিত, গুলিবিদ্ধ দেহ ফেলে রাখা হয় জামসেদপুর রেললাইনে..


হুল দিবস উৎসব নয়, হুল দিবস এই ভারতের , পাহাড়, জঙ্গলে বাস করা,  প্রকৃতির মাঝে  বেঁচে থাকা অকৃত্রিম আদি জনজাতির আত্মোৎসর্গের স্মরণদিবস ;


যে গুরুত্ব দিয়ে ক্ষুদিরামের নাম উচ্চারিত হয়, সেই গুরুত্ব দিয়েই সিধু, কানু , চাঁদ , ভৈরোর নাম উচ্চারিত হোক ;

যে শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গীনি হাজরার নাম উচ্চারিত হয়, সেই শ্রদ্ধার সঙ্গেই এই বিদ্রোহী ভাইদের দুই লড়াকু বোন ফুলো ও ঝানো মুর্মুর নামও স্মরণ করা হোক ;

কর্পোরেট সেক্টরের ইচ্ছেমত আদিবাসী অধ্যুষিত জঙ্গল কেটে রিসর্ট, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, কারখানা  তৈরি বন্ধ হোক ;

মাওবাদী সন্দেহে ছত্রিশগড়, ঝাড়খন্ডের নিরীহ  আদিবাসী যুবকদের ওপর ইচ্ছেমত টর্চার বন্ধ হোক ;

হুল দমনপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার ; শাল পলাশ মহুল আকীর্ণ পাহাড়ঘেরা গ্রামগুলো থেকে যে কোন সময় সিধু কানুরা ধমসা মাদলের বজ্রনির্ঘোষে হুলের আহ্বান দেবেন..এই বিশ্বাস আদিবাসীদের, আমাদেরও...

 _____________________________________________________

লেখা ও ছবি:- দুর্গাদাস মহান্তি।।

Post a Comment

Please do not enter any spam link in the comment box.

Previous Post Next Post